উদাসীনতা ও আত্মসম্মান

উদাসীনতা এক আদিমতা

আমাদের ছোটবেলার জীবনটা একরকমের। আস্তে আস্তে আমরা যত বড় হই, তত যেন জীবনের ভাব প্রতি মুহূর্তে আস্তে আস্তে পাল্টে যায়। এর কারণগুলি সব সময় আমাদের সামনে পরিষ্কার হয়ে ধরা পড়ে না। খানিকটা যেন ধোঁয়াশায় থেকে যায়।

উদাসীনতা এক আদিমতা
উদাসীনতা এক আদিমতা

জীবনের বহু বছর পার করে , অনেকটা দূরে সরে এসে, এখন একটা কথাই মনে হয়।
উদাসীনতার একটা বিশেষ দিক আছে। উদাসীনতার একটা বড় কারণও আছে।

তুমি, আমি, আমরা সবাই চাইলেই উদাসীন হতে পারি না। আমাদের ভিতরে একটা দ্বায়িত্ববান মানুষ আছে। আমরা চেষ্টা করলেই, চোখ বুজে থাকতে পারি না।

তবে কখনো কখনো পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের অনিচ্ছাকৃতভাবে খানিকটা না দেখার ভান করে চোখ বুজে থাকতে হয়। বলা যেতে পারে চোখ বুজে থাকতে বাধ্য করে আমাদের পরিস্থিতি। পরিস্থিতি এমন একটা বস্তু যেটা আমাদের মন মানসিকতার বাইরে গিয়ে কাজ করতে বাধ্য করে। আমাদের অন্যরকম মানুষের পরিণত করে দেয়। । আমরা তখন ভিতরে এক। বাইরে এক। অদ্ভুত এক কম্বিনেশন।

অনেকে হয়তো আমাদেরকে বাইরে থেকে আমাদের নানা দোষ ত্রুটি , তুলে ধরে বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে, এইগুলি আমার ভুল ! বা এগুলো করা আমার ঠিক হচ্ছেনা ! কিন্তু আমরা তখন বুঝতে পারি ইচ্ছা টা একেবারেই এখন আর আমার আয়ত্তের মধ্যে নেই। সীমিত হয়েছে বা বা সিমিত করতে বাধ্য হয়েছি এখন।

আসলে, সবাই চিৎকার করে নিজের কথা বলে না, চিৎকার করে বলতে পারেনা , চিৎকার করে বলতে পারাও যায় না। কোন একটা বাঁধা যেন দুহাত তুলে আগলে দাড়াই।

চিৎকার করে বলা যায় না ভালোবাসি । চিৎকার করে নিজেকে জাহির করাও যায় না, চিৎকার করে অন্যের কাছে নিজেকে প্রমাণ করা কেমন যেন লজ্জার হয়ে দাঁড়ায়।

এই সময়,
এ ধরনের মানুষ হয়ে ওঠে, অরণ্যের মতো গভীর আর গম্ভীর।
একদম ভিতরে না এসে দাঁড়ালে, ওর শব্দ শোনা যায় না।


বয়স বাড়লে, আমরা অরণ্যের মতো নিস্তব্ধ হয়ে পড়ি ক্রমশ। কেউ একটু আগে, কেউ একটু পরে। আসলে এক ধরনের আদিমতা আমাদের রক্তে, তাই উদাসীন হতে হবে, তাই অরণ্য হতে হবে সবাইকেই।
একটু আগে বা পরে। হতে হবেই।।

উদাসীন হতে হবে, অরণ্য হতে হবে
উদাসীন হতে হবে, অরণ্য হতে হবে

উদাসীনতা ছাড়াও অনুভূতি ও আমাদের জীবনের একটা বড় অংশ দখল করে থাকে। এখানেও আমরা কখনো কখনো কিছুটা ভুল করে থাকি। আমরা বুঝতে পারি না কোথায় কার কাছে আমাদের অনুভূতিগুলোকে প্রকাশ করা উচিত , বা কোথায় সেগুলো প্রকাশ করা উচিত নয়!

কিছু কিছু জায়গা আছে যেখানে নিজের অনুভুতি যত প্রকাশ না করবেন ততই ভালো। এক কথায় যেখানে সেখানে অনুভূতি জাহির না করাই ভালো। খুব বেশি হলে হয়ত সাময়িক সময়ের জন্য আমাদের বুকের ভিতর একটা যন্ত্রণা দুমড়ে মুছরে উঠবে, হৃদয় ফাঁটবে, চোখজুড়ে কান্নারা বাসা বাঁধবে, নিজেকে পাগল পাগল লাগবে।

কিন্তু বিশ্বাস করুন, একবার যদি ঐ সময়টুকুতে দাঁতের উপর দাঁত রেখে নিজের আবেগ, অনুভুতিকে দমিয়ে রাখা যায় তবে পরবর্তী লম্বা সময়ে প্রশান্তি নিয়ে বেঁচে থাকা যাবে।

কারন আবেগের থেকে আত্মসম্মানের মূল্যায়ন অনেক বেশি। আবেগ এক সময় না এক সময় কেটেই যায়, কিন্তু আত্মসম্মানবোধ শেষ হয়ে গেলে মানুষের বেঁচে থাকার ইচ্ছাটাই মরে যায় ।

আত্মবিশ্বাস ও আত্মসম্মান সম্পর্কে জানতে এখানে ক্লিক করে ভিডিওটি দেখে নিতে পারেন ।

এর বাইরেও বেশ কিছু মানুষ আছেন, যারা যাদের ভিতরে আবেগটা সেভাবে নেই, আত্মসম্মান বোধটাও সেভাবে কাজ করে না। তারা কিন্তু আপনার সামনে আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে বেশ হাসি আনন্দে জীবন কাটিয়ে দেবে।

এটা দেখে যদি আপনার আত্মসম্মানের প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধাবোধ থাকে, আপনাকে সেই মানুষগুলোর থেকে অনেক দূরে থাকতে হবে। না হলে প্রতিমুহূর্তে এই মানুষগুলো আপনাকে তিলে তিলে কষ্ট দিয়ে মারতে থাকবে। যাদের মধ্যে আত্মসম্মানবোধ নেই, তারা অনেকটাই নৃশংস প্রকৃতির হয়। দয়া মায়া বিষয়টিও তাদের মধ্যে প্রায় থাকে না বললেই চলে। তারা এত কথা বলবে যে, আপনার মনে হবে, কত মহান মনের অধিকারী সেই মানুষ টা। আসলে তার অভিনয়ের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে একটা কুটিল, কুচক্রী, ধান্দাবাজ মানুষ।

আত্মসম্মানবোধ মানুষের কিন্তু একদিনে গড়ে ওঠে না। এটা অনেকটা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া পারিবারিক ধন-সম্পত্তির মত। যার নেই সে ফকির। যার সামান্যতম আছে সে রাজা বা রাজার মতো আচার-আচরণ। সেজন্য যেসব মানুষের আত্মসম্মানবোধ আছে, তারা অনেক সময়ে সামান্য লাভের আশায়, নিজেকে খাটো করতে পারে না। নিজেকে অসম্মানিত করতে পারেন না।

একজন সম্মানিত মানুষ যখন দিনের পর দিন, এই সম্মানহীন মানুষের দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়, তখন তার মধ্যে এক ধরনের উদাসীনতা চলে আসে। আস্তে আস্তে সে একা হয়ে পড়ে। বা বলা যেতে পারে সে নিজেকে সবার থেকে সরিয়ে নিয়ে, একটা অন্য জীবনের মধ্যে ঢুকে পড়ে। সেখানে সে সুখ খুঁজে পায়। সেখানেই সে শান্তি খুঁজতে থাকে।

যদি কখনো এমন হয়, যে আমরা বুঝতে পারছি আমরা পারিপার্শ্বিক চাপে একা হয়ে যাচ্ছি, তখন নিজেকে ছোট ভাবার কোন কারণ নেই, এটা ভাবার কোন কারণ নেই যে আপনার ভুলেই এটা হচ্ছে ! এমনও হতে পারে, তাদেরই বোঝার ভুল আপনাকে। তারাই আপনার মন মানসিকতা এগুলো কোনটাকে খুঁজে পায়নি, বা বুঝতেও চায় না। কারণ আপনার বা আমার কাছে যেগুলো মূল্যবান, হয়তো তাদের কাছে সেটা মূল্যহীন।

আপনাকে যারা মূল্যহীন ভাবছে। আপনাকে যারা ছোট ভাবছে। তাদের কি কি আপনি আপনার গুরুত্ব বোঝাতে চেষ্টা করবেন ? সেটা কখনো সম্ভব ?

যে বস্তু থাকলে মানুষের মধ্যে যে বস্তু থাকলে, মানুষ মানুষকে বুঝতে পারে, সেই জিনিসটারই তো আজ বড় অভাব ! বেশিরভাগ মানুষের ভিতরেই সেই গুন বড় একটা দেখা যায় না। তাহলে তো পৃথিবীর সবাই মানুষ হয়ে যেত ? সেজন্যই তো ভালো মানুষকে খুঁজে বের করতে হয় । আর মন্দ মানুষগুলো আপনার সামনে হাজির হয়ে, প্রমাণ করতে চেষ্টা করে তারাই আসল মানুষ।

 আত্মসম্মান
আত্মসম্মান

তবে যাদের মধ্যে মানবিক গুন আছে, তারা অবশ্যই বুঝে নেয়, কে মানুষ ? আর কে মানুষ নয় !

যদিও দুজনই দেখতে মানুষের মত !

এই ধরনের লেখা আরো পাবার জন্য, এখানে ক্লিক করুন ও আমার সঙ্গে থাকুন, পড়ুন এবং ভালো লাগলে অবশ্যই আপনার ভালো লাগা মানুষদের সঙ্গে শেয়ার করুন। কোন পরামর্শ থাকলেও নিঃসন্দেহে কমেন্ট বক্সে জানাবেন। এতটা সময় ধরে আমার লেখাটা পড়ার জন্য আপনাদের সকলকে আরো একবার ধন্যবাদ। সকলে ভালো থাকবেন। সকলের সুস্থ থাকবেন। আবার দেখা হবে পরের আর্টিকেলে । নমস্কার।

Leave a Comment